গরমের রোগবালাই

স্বাস্থ্য

গরম পড়েছে বেশ। আবার হঠাৎ বৃষ্টি। আবহাওয়ার মেজাজ বোঝা দায়। এই গরমে ঘেমে-নেয়ে উঠছেন তো আবার বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। এ সময় ঠান্ডা পানি পান, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহারের প্রবণতাও যায় বেড়ে। পরিবেশের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার কারণে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি ও সংক্রমণও হয় বেশি। দেশে কিছু রোগবালাই গরমেই বেশি হয়। প্রতিবছর গ্রীষ্ম, বর্ষাকালে রোগগুলোর প্রকোপ বাড়ে। তবে একটু সচেতন হলে এড়ানো সম্ভব এই রোগগুলোকে।

এ সময় পানিবাহিত রোগ বেড়ে যায়। যার মধ্যে অন্যতম হলো টাইফয়েড। দূষিত খাবার ও পানি দিয়ে এই সংক্রমণ ছড়ায়। উচ্চমাত্রার জ্বর, কখনো ডায়রিয়া, দুর্বলতা ইত্যাদি হলো উপসর্গ। টাইফয়েড হলে অ্যান্টিবায়োটিক উচ্চমাত্রায় ও একটু বেশি মেয়াদে দিতে হয়, কখনো শিরায় দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। এ রোগের চিকিৎসা অন্যান্য সংক্রমণজনিত চিকিৎসার চেয়ে ভিন্ন। রক্তের কালচারের মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক সঠিক মাত্রায় না দিলে কাজ হয় কম। কিন্তু সাধারণ প্রবণতা হলো জ্বর হলে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই নিজে নিজে এক কোর্স অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করে ফেলা। এ কারণে পরবর্তী সময়ে রোগ শনাক্ত হতে সমস্যা হয় এবং ভোগান্তি ও খরচ দুটোই বাড়ে। তাই জ্বর যদি উচ্চমাত্রার হয় ও ৫-৭ দিনের বেশি স্থায়ী হয়, সে ক্ষেত্রে টাইফয়েডের পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক নিন।

গরমের সময় পানিবাহিত জন্ডিস বা হেপাটাইটিস-ই এবং এ–এর প্রকোপ বাড়ে। এতে অরুচি, চোখ ও প্রস্রাব হলুদ রং ধারণ করা, দুর্বলতা, জ্বর হতে পারে। হেপাটাইটিসের চিকিৎসা হলো পূর্ণ বিশ্রাম আর কোনো ওষুধ না খাওয়া। এটি এমনিতেই সেরে যাবে।

সর্দি-গর্মি

গরমকালে ফ্লু বা সর্দি–গর্মির রোগীও বাড়ে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক। এমনিতে সাধারণ সর্দি-গর্মি বা ইনফ্লুয়েঞ্জা ৫-৭ দিনের বেশি স্থায়ী হয় না। এতে জ্বরের সঙ্গে গলাব্যথা, কাশি, সর্দি, নাক বন্ধ, চোখ লাল, নাক দিয়ে পানি পড়া, মাথাব্যথা ইত্যাদি থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে কোভিড পরীক্ষাও করতে হবে, কারণ কোভিডের লক্ষণগুলো ফ্লুর মতোই। যদি করোনা না হয়ে থাকে তবে সাধারণ প্যারাসিটামল, অ্যান্টি হিস্টামিন জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। গরম স্যুপ, গরম আদা–চা ইত্যাদি খেলে আরাম হবে। বিশ্রাম নিতে হবে আর প্রচুর পানি পান করতে হবে।

হিট স্ট্রোক

প্রচণ্ড গরমে অনেকক্ষণ রোদে বা বাইরে থাকলে হিট স্ট্রোক হতে পারে। হিট স্ট্রোক হলে শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়, ত্বক একেবারে পানিশূন্য হয়ে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তি ভুল বকতে পারে বা অর্ধচেতন বা অচেতন হতে পারে। সাধারণত দীর্ঘ সময় বাইরে বা গরম পরিবেশে যাঁরা কাজ করেন, কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক এবং দীর্ঘক্ষণ রোদে দাঁড়ালেও এমন হতে পারে। কারও এমন হতে দেখা গেলে দ্রুত তাকে অপেক্ষাকৃত শীতল জায়গায় সরিয়ে নিতে হবে। ফ্যান ছেড়ে দিতে হবে এবং জামাকাপড় খুলে দিতে হবে। ভেজা কাপড় দিয়ে গা মুছে দিতে হবে। চেতনা থাকলে মুখে পানি দিতে হবে কিন্তু অজ্ঞান হলে জোর করে নয়। দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

চর্মরোগ

গরমে ঘাম বেশি হয় বলে কিছু চর্ম রোগও বেশি হয়। যেমন ঘামাচি বা ছত্রাক সংক্রমণ। অনেকে ঘামাচির স্থান চুলকে সংক্রমণ করে ফেলেন। ত্বক লাল হয়ে যায়, চুলকায়। ঘামাচি প্রতিরোধে ঘামে ভেজা কাপড় পাল্টে ফেলবেন বা ঘাম মুছে ফেলবেন। অন্তর্বাস, মোজা ইত্যাদি কখনোই না ধুয়ে আবার পরদিন পরবেন না।

পানিশূন্যতা

গরমের সময় শরীর পানি হারায়। তাই সহজেই পানিশূন্যতা হয়। এ জন্য গরমে বারবার পানি পান করুন। মনে রাখবেন, পানির অভাব কিন্তু চা, কফি, জুস, কোমল পানীয় ইত্যাদি দিয়ে পূরণ হয় না। বিশুদ্ধ পানিই পান করা উচিত বেশি করে। ঘামের সঙ্গে পানি ও খনিজ লবণ বা ইলেকট্রোলাইটস দুটোই হারাই আমরা। তাই একটু ডাবের পানি, লবণ পানি বা প্রয়োজনে স্যালাইন খেতে পারেন। চোখ–মুখ গর্তে ঢুকে যাওয়া, মাথা ঝিমঝিম করা, প্রস্রাব কমে যাওয়া ইত্যাদি হলো পানিশূন্যতার লক্ষণ। পরিবারে ছোট শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা পানিশূন্য হয়ে পড়লেন কি না, খেয়াল রাখুন।

বদহজম

গরমকালে তাপমাত্রা বেশি বলে খাবার নষ্ট হয় দ্রুত। ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধে। সেই খাবার খেলে ফুড পয়জনিং হয়। কোনো খাবার খেয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বমি, ডায়রিয়া ও জ্বর শুরু হলে বদহজম বা ফুড পয়জনিং হয়েছে বুঝতে হবে। বাসি ও বাইরের খাবার থেকে দূরে থাকবেন। ফ্রিজের খাবার ভালো করে গরম করে খেতে হবে।